নূরলদীনের সারাজীবন: যুগে যুগে জেগে ওঠা বিপ্লবীদের প্রতিচ্ছবি
বিট্রেনে শিল্পের বিপ্লব ঘটছে। তাদের শিল্পে তখন নীলের প্রয়োজন ছিলো। আর এই নীলের যোগান হতো এ বাংলা অঞ্চল থেকে। এদিকে পলাশীতে নবাব সিরাজদৌলার পতনের পরে দেশের দেওয়ানগিরি চালায় গোরা কোম্পানির লোকে। তাদেরই হুকুমে এখানে নীল চাষ হতো। সে নীল চাষে যে কৃষক অনাগ্রহ প্রকাশ বা প্রতিবাদ করতো তাকে কুঠিতে নিয়ে নির্যাতন করতো কোম্পানির লোকেরা। এই নির্যাতন এতটাই নির্মম ছিলো যে “নীল দর্পণ” নাটকে তার কিছুটা বর্ণনা উল্লেখ আছে। এছাড়াও ইতিহাসে আছে, ‘শাস্তিস্বরূপ কৃষকের মাথায় কাঁদামাটি লেপ্টে দিয়ে তাতে নীলের বীজ দিয়ে দেওয়া হতো এবং বীজ থেকে নীল গাছ না গজানো পর্যন্ত কৃষক মাথা থেকে ওই মাটি সরাতে পারতো না।’ শুধু নীল চাষ নয়; ওই জমিনের খাজনাও আদায় করতো তারা। অথচ তারা এই জমিনের মালিক নয়। নূরলদীনের ভাষায়, “গলায় দিয়ে রশি হামার হুকুম জারি করে-/ ধানের বলদ নগদ টাকায় খাজনা দিবার তরে/ বুদ্ধিটা কি ঠাহর করি দ্যাখেন তবে ভাই,/ ধান বেচিতে সেই মহাজন ছাড়া উপায় নাই।/ ধান করিব পাট করিব রক্তঝরা ঘামে,/ ধান কিনিবে মহাজনে নিজের খুশি দামে।” এই সকল শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এমনই এক কৃষক নেতা নূরলদীনের কথা নিয়ে রচিত কাব্যনাট্য ‘নূরলদীনের সারাজীবন’।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সব্যসাচী অতিধায় অভিষিক্ত লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ঐতিহাসিক সৃষ্টি এই কাব্যনাট্য। তিনি তার কাব্যনাট্যের সামাজিক এবং ঐতিহাসিক ঘটনাকেই আশ্রয় দিয়েছেন। তেমনই নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাট্যের বিষয়টা ইতিহাস থেকে নেওয়া। এর প্রেক্ষাপট এগারো’শ উননব্বই সনের রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ। কাব্যনাট্যের চরিত্রগুলো নূরলদীন, দয়াশীল ও গুডল্যাডকে ইতিহাস থেকে নিয়েছেন এবং কল্পনায় এঁকেছে আব্বাস, আম্বিয়া, লিসবেথ, টমসনও মরিসকে। এছাড়াও নূরলদীনের আত্মা এবং প্রেরণা আমাদের ইতিহাসেরই অংশ এমনটাই লেখক উল্লেখ করে তার ভূমিকাতে বলেছেন, “যে জাতি অতীত স্মরণ করে না, সে জাতি ভবিষ্যত নির্মাণ করতে পারে না। এই মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন এমন যে সব গণনায়কদের আমরা ভুলে গেছি তাদের আবার আমরা সম্মুখে দেখবো এবং জানবো যে আমাদের গণআন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ দিনের ও অনেক বড় মহিমার- সবার উপরে, উনিশশো একাত্তরের সংগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।”
নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাট্যে লেখক গ্রাম্য মানুষের মুখের ভাষার সৌন্দর্য অক্ষুন্ন রেখে সুনিপুণভাবে কথামালা সাজিয়েছেন। আর ইংরেজদের কথায় আছে চলিত বাংলার সুর। নাটকের প্রতিটি চরিত্রের কথপোকথনে রয়েছে কাব্যের ছন্দ। এছাড়াও আপন কল্পনায় লেখক যেন মঞ্চ সাজিয়ে একে একে প্রতিটি চরিত্র এঁকেছেন। একদিকে ইংরেজদের সাথে বিদ্রোহ অন্যদিকে আম্বিয়ার সাথে তার সাংসারিক জীবনের কথা এসেছে নাটকে। শুরুতে নূরলদীনের রক্তাক্ত দেহ আনা হলে কুঠির লোক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। এতেও কারো বিশ্বাস হয় না যে তাদের নেতা নূরলদীন আর নেই। এমন সময় দয়াশীল বলে, ‘ক্যানে, ক্যানে, ক্যানে?/ ক্যানে হামাক না তুলিয়া নিছে ভগবানে?’ এরপরে স্মৃতির পাতার মতোই নূরলদীনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এদিকে উচ্ছ্বাস করা কোম্পানির লোক এদেশেরই দোসর। তারা গোরা ইংরেজের সাথে যোগ দিয়ে কুঠির মানুষ হয়েছে। নিজের সুবিধার জন্য নিজ দেশের মানুষকে তারা শোষণ করতে সাহায্য করে। নূরলদীন শোষণকারীদের চেনান এভাবে, “তফাত করি না দেখিবেন উয়ার মধ্যে ভাই,/ যে করেছে শোষণ হামাক শোষণকারী তাঁই।/ চামড়া কালা, চামড়া ধলা, তফাত কোনো নাই,/ যে মারিছে জানে হামাক, জানের শত্রু তাঁই।”
নূরলদীন জেগে উঠে। সে মানুষকে সংঘবদ্ধ করতে থাকে। চারপাশের সকলকে বুঝায়। তারা কৃষকরা মাঠে পরিশ্রম করে এবং তাদেরই জমি সোনার ফসল দেয়। অথচ সেই ফসলে তাদেরই অধিকার নাই। এভাবে তারা তাদের খাজনা পরিশোধ করতে গিয়ে জঙ্গল, গোরস্থান, শ্মশান, বাপদাদার বাড়ি, ভিটেমাটি একে একে সবই গেছে তাদের দখলে। জুলুমকারীর বিরুদ্ধে মজলুমের এই জেগে ওঠাকে ইংরেজরা দস্যুতা আখ্যা দিয়েছিল। যারাই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে তাদের উপর জরিমানা ন্যস্ত করেছে। শুধু এতেই ক্ষান্ত নয়; বিদ্রোহী ধরা পড়লে তাকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রেখেছে যতদিন না পঁচে গলে যায়। কিন্তু শোষণ আর শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট ক্ষুধার্ত জীবন যখন আর চলে না, তখন সামনে এগিয়ে না এসে তাদের কোনো উপায় থাকে না। তাদের জীবনের দিকেই তাকিয়ে থাকে তাদের সন্তানেরা। নূরলদীন বলে এভাবে, “হামার সন্তান কান্দে খা-খা আঙিনায়।/ পুন্নিমার চান, তার কিবা আসি যায়?/ পুন্নিমার চান নয়, অনাহারী মানুষেরা চায়/ ধানের সুঘ্রাণে য্যান বুক ভরি যায়,/ পুন্নিমার মতো হয় সন্তানের মুখ রোশনাই।”
সৈয়দ শামসুল হক ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ নাটকে সময়কে বেঁধেছেন। একই সাথে এঁকেছে সংগ্রামী মানুষের জীবন। সবাই যখন নূরলদীনকে নেতা মানে; তখন তার স্ত্রী আম্বিয়া খোয়াবে দ্যাখে নূরলদীন সিংহাসনে বসা; আর তার পাশে রাণী বেশে আম্বিয়া আছে। নাটকের এই অংশে বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক নেতাদের কথা মনে করিয়ে দিবে। এখানে নেতারা ক্ষমতায় গেলে অর্থ আর ক্ষমতার পাহাড় গড়ে। আবার কখনো কখনো তাদের স্ত্রী তাদের চেয়েও বেশি সম্পদশালী হয়। কিন্তু নূরলদীন তো এমন কেউ নয়। তার সংগ্রাম আর ত্যাগ তাকে গণনায়কের আসনে বসিয়েছে। তবুও আব্বাস আম্বিয়ার ওই সিংহাসনের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তখন নূরলদীন আব্বাসের কথার জবাবে বলে, “তোমার কথায়, বাহে, এক সাথে আছোঁ আজীবন/ য্যান দুই ভাই।/ তোমার অজানা নাই/ অন্তরে হামার এই অগ্নির কারণ/ যাতে পুড়ি যায় সিংহাসন।/ তোমার অজানা নাই/ কতকাল ধরি এই অগ্নি জ্বলে, কতদিন হতে।/ অবিশ্বাস তবুও দ্যাখো তোমার চোখেতে।”
‘কতকাল ধরি এই অগ্নি জ্বলে…।’ নূরলদীনের অন্তরে কষ্টের আগুন জ্বলে। নূরলদীন তখন আট দশ বছরের ছোট কিশোর। বাপ তার একদিন লাঙল ঠেলিতে মাঠে নিয়ে যায়। নূরলদীন বেশ আনন্দের সাথে মাঠে যায়। কিন্তু যে আনন্দ আর ফুর্তি নিয়ে মাঠে যায়; তা যেন নিমিষেই ম্লান হয়ে ওঠে। নূরলদীন স্তব্ধ মেরে দ্যাখে বাপ তার নিজ কাঁধে জোয়ার তুলে নিলো। তখন নূরলদীন কেঁদে বাপকে জিজ্ঞেস করলো, “বাপজান, তুমি ক্যানে? বলদ কোন ঠাঁয়?” তখন বাপ তার বলেছিল, “বলদ তো নাই বাপ, বেচিয়া নগদে/ রাজার খাজনা শোধ দিনু কোনোমতে।” কিশোর নূরলদীন নাঙল হাতে ধরে থাকে; তার হাত কাঁপে। বাপ তার জোয়াল কাঁধে জমিন চষে যায়। মানুষ হয়ে গরুর মতো টানতে গিয়ে ঘাড় ভেঙে নুরুলদীনের বাবা মারা যায়। বাবার মৃত্যুর সময় নূরলদীন শোনে, “বাপজান, বাপ মোর ভাগাড়ে অন্তিমকালে পশুর মতন,/ ডাক ভাংগি উঠিল হাম্বায়/ মানুষ উঠিল ডাকি পশুর ভাষায়।” এ সময় নূরলদীন তার কণ্ঠেও মানুষের বদলে গরুর হাম্বা ডাক শোনতে পায়। গোরা ইংরেজ কোম্পানির শাসনে এ মাটির মানুষের জীবনের মর্যাদা যেন পশুর সমান হয়েছিল তারই রূপক ব্যবহার হতে পারে নূরলদীনের এ কণ্ঠস্বর।
এই স্মৃতি নূরলদীনকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তার সংগ্রাম গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে প্রতিটি সংগ্রামে থাকে নারীর নিরব ত্যাগ। যা সামনে আসে না কখনো। ইতিহাস শুধু বাহিরের যুদ্ধ আর বীরত্বের কথাই লিখে। তাদের বীরত্বের কথায় রাজ-প্রসাদের ভিতরে নারীর ত্যাগ আর অপেক্ষার কথা চাপা পড়ে যায়। এখানে আম্বিয়ার কথা ভুলে যায়নি লেখক। আম্বিয়া বলে, “অভাগিনী আম্বিয়ার/ কপাল হইবে কি আর/ তাকে বসি পাংখা করিবার?/ মিছরি গুলি শরবত দিবার?/ জংগ হতে ফিরিয়া আবার/ আর কি আনিয়া দিবে আম্বিয়ার সিঁথির বাহার?” নূরলদীন তার পরিবারের অসহায়ত্বের কথা জেনেও কৃষকের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে। তার লড়াইয়ে অনেকেই যোগ দেয়। নাটকের দৃশ্য শেষ দিকে আসে। নূরলদীন দেখার অপেক্ষায় থাকে। তার অপেক্ষা যেন বাঙালির এক অপূর্ণ স্বপ্ন, “নবান্নের পিঠার সুঘ্রাণে দ্যাশ ভরি উঠিতেছে…/ হামার গাভীন গাই অবিরাম দুধ ঢালিতেছে।…/ সোনার বাংলার সোনা বাংলাদেশে আছে।”
জুলুমবাজ এবং শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করে নূরলদীন। তার এ লড়াইয়ে তার মৃত্যু হয়।কৃষকের মুক্তির লড়াইয়ে নূরলদীনের আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে এ মাটির মানুষের জীবনে নতুন স্বপ্নের সূচনা হয়। তার বিদ্রোহ এবং জাতিসত্তা পরবর্তী ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান সবশেষে মুক্তিযুদ্ধে শক্তি সঞ্চার করেছে। নাটকের শেষ সংলাপের দিকে নূরলদীন বলে, “ভাবিয়া কি দেখিবো, আব্বাস, যদি মরোঁ, কোনো দুঃখ নাই।/হামার মরণ হয়, জীবনের মরণ যে নাই।/ এক নূরলদীন যদি চলি যায়,/ হাজার নূরলদীন আসিবে বাংলায়।/ এক এ নূরলদীন যদি মিশি যায়,/ অযুত নূরলদীন য্যান আসি যায়,/ নিযুত নূরলদীন য্যান বাঁচি রয়।” দারিদ্র অসহায় মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের মন্ত্র নিয়ে নির্মিত এ নাটকের শেষ সংলাপে আব্বাস বলে, “ধৈর্য সবে- ধৈর্য ধরি করো আন্দোলন।/ লাগে না লাগুক, বাহে এক দুই তিন কিংবা কয়েক জীবন।”
কাব্যনাট্য: নূরলদীনের সারাজীবন, লেখক: সৈয়দ শামসুল হক
লেখক: কবিওয়ালা
