মৃণাল সেনের পদাতিক’র পর্দায় বিপ্লবীর জীবন
সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেন খুব কাছাকাছি সময়ের মানুষ। চলচ্চিত্র জগতে তবুও মৃণাল সেন নিজেকে আলাদা করার জন্য অন্য পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর সৃষ্টিতে রাজনীতির কথা আসে। এই রাজনীতির কথার মাধ্যমে আসে সমকালীন বিষয়। নকশাল আন্দোলন ও তার পরবর্তীতে সময়ে মৃণাল সেনের নির্মিত সিনেমা ‘পদাতিক’। সিনেমাটিতে কয়েকজন বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী, একটা মধ্যবিত্ত পরিবার ও এক ডিভোর্সি মহিলাকে নিয়ে গল্পের কথা সাজানো হয়েছে। ষাটের দশকের ভারতবর্ষে কলকাতার সমস্যা সংকুল মহানগরী ও বেপরোয়া নাগরিক জীবন ছুয়ে যায় সুমিত নামের যুবককে। যুবকের এই উপলব্ধি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যুগ যুগ ধরে চলমান।
মনে হয় এই বুঝি শহরটা শেষ হয়ে গেলো। কিন্তু, না। সময়ের সাথে সাথে আরও ব্যস্ত, আরও বড় বড় দালান, আরও দূষণ সব এক সাথে চলছে। তার সাথে মানুষ রোবট হয়ে নিজেকে টিকে রাখার লড়াইয়ে ছুটছে। নিজেকে টিকে রাখার লড়াইয়ে সবাই ছুটলেও কেউ কেউ সমাজ ও মানুষের সভ্যতা টিকে রাখার জন্য স্রোতের বিপরীতে লড়াই করে। ওদেরই একজন সুমিত। এই সুমিতেরা জীবন বাজি রেখে জাহান্নামের আগুনে বসে পুষ্পের হাসি হাসতে চায়। তারা লড়তে চায় দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অসমতা, জুলুমবাজ এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে।
মধ্যবিত্ত আয়ের চাকুরীজীবী বাবার সন্তান সুমিত। সুমিতের মতো তার বাবা একসময় স্বপ্ন দেখেছিল বিপ্লবের; বলশেভিক, লেলিন, বিপ্লব, সাম্য, জেল ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এ পথ সহজ নয়। এখানে অনেক সময় নেতারা তাদের দেশপ্রেমের আবেগকে কাজে লাগিয়ে তাদের ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে। সংগ্রামে আমাদের শত্রু কে? বন্ধুই বা কে? তার কিছুই জানি না। আবার কোনো সংগ্রামই সফল হতে পারে না যদি সংগ্রাম ভুল পথে চলে যায়। এখন সুমিতের বাবার লড়াই অন্য পথে; সংসার বাঁচানোর সংগ্রাম। অন্যদিকে এই বাবার ছেলের স্বপ্ন দেশ আর মানুষকে নিয়ে। একদিন মানুষের মুক্তি আসবে। কিন্তু তার আগে অধিকার, কুসংস্কার, দারিদ্র্য, শোষণ সহ সকল রকম আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও বিপ্লব প্রয়োজন।
সেই বিপ্লবের পথের সূত্র ধরে সুমিত আত্মগোপনে আশ্রয় নিয়েছে এক মাঝবয়সী ডিভোর্সি নারীর বাসায়। জীবন নিয়ে এই নারীর সংগ্রামটা ভিন্ন রকম; স্বপ্ন ছিলো স্বামীর সাথে ছোট্ট সংসার আর নাড়ি কাটা ধন সন্তানকে বুকে আগলে রাখবে। কিন্তু তার কিছুই হয়নি তার। একমাত্র ভাই ছিলো সেও এক সংগ্রামে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। বাড়ি ছেড়ে যাবার পরে শেষ চিঠিতে সে জানায়, ‘আমার কথা ভাবিস নে। আমি একা নই। আমার সাথে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষ৷ তারা লড়াই করছে এবং নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। এরা লড়ছে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকাসহ পুরো পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষ। তাদের মাঝেই আমি বেঁচে রবো।’ এখন তার বাসায় আশ্রয় নেওয়া ছেলে সুমিতের মাঝেই যেন সে তার ভাইয়ের প্রতিচ্ছবি দেখে।
এদিকে শাসকরা থেমে নেই। তারা এদের দমন করতে চায়। পেশি শক্তি দিয়ে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে দিয়ে তারা দমন করতে থাকে। অন্যদিকে তাদের পক্ষে সমর্থন দেখানোর জন্য তারা লোক জমাবে। লোক জড়ো করবে। ট্রেনে চাপিয়ে, বাস ভাড়া করে, হাঁটিয়ে, মিছিল করে, ভিন্ন ভিন্ন এলাকা থেকে নিয়ে আসবে, খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করবে; ছেলেমেয়ে পুরো সংসার নিয়ে বেড়িয়ে পড়বে শহর দেখতে। এই জমায়েত দেখিয়ে শাসকরা বলবে সন্ত্রাসীদের (বিপ্লবীদের) কোনো সমর্থক নেই। এই দৃশ্য দেশে দেশে চলা বর্তমান রাজনীতির কার্বন কপি মনে হবে।
সুমিত আত্মগোপনে। আত্মগোপনে থাকাকালীন তার মনে কিছু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। লড়াইয়ে সঠিক পথ না দেখালে, পাশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসের বন্ধুত্ব না থাকলে বিপ্লব সফল হয় না। এখানে কে কার বন্ধু বা শত্রু? এমন প্রশ্নে দলের অন্য সদস্য বিমান ও নিখিলের মাঝে সন্দেহের সঞ্চার হয়। কিন্তু সে যে লড়াইয়ে গেছে সেখান থেকে পিছনে ফেরা সম্ভব নয়। এদিকে তার কাছে খবর আসে মা অসুস্থ। এক সময় চিকিৎসাহীন অবস্থায় মারা যায় তার মা। মাকে দেখতে গেলে বাবা তাকে ডেকে বলে, ‘এখানে থাকা তোর ঠিক হবে না৷’ অথচ এই বাবাই তার ছোট ছেলেকে চাকরিতে ঢুকাতে চেষ্টা করে। অন্যদিকে বড় ছেলেকে মানুষের লড়াইয়ের তরে দিয়ে দেয়। মায়ের লাশ ফেলে মুখাগ্নি না দিয়ে চলে যায় একজন বিপ্লবী; একজন পদাতিক।
সিনেমা: পদাতিক, পরিচালক: মৃণাল সেন
লেখক: কবিওয়ালা
