বিবেকের পালায় গণনায়ককে হত্যা; পঁচাত্তরের ইতিকথা
বাংলা সাহিত্যের কাব্যনাট্যে সমকালীন জীবনের জটিল বাস্তবতা রূপায়ণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। তাঁর কাব্যনাট্যে অকৃত্রিমভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে সমকালীন বাংলাদেশের সমাজচিত্র। দেশ স্বাধীনের পরে উনিশশো পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনা ও রাজনীতি নিয়ে রচিত কাব্যনাট্য গণনায়ক। নাট্যকার নাটকের শুরুতে বলেছেন, ”পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকটি লেখার পর গণনায়ক লেখা আমার জন্য অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। আমি এই রচনায় ‘রাজনৈতিক কিছু অভিজ্ঞতাকে’ পরীক্ষা করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছি।” এই নাটক রচনাতে তিনি শেক্সপিয়ারের জুলিয়ার সিজার নাটককে অনুসরণ করেছেন।
সৈয়দ শামসুল হক তাঁর এ নাটককে রাজনৈতিক ময়দানে বিবেকের পালা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “রাজনীতির লক্ষ্য কি জীবনের লক্ষ্য থেকে ভিন্ন? ন্যায়-অন্যায় বোধ কি ব্যক্তিগত পর্যায়ে আর সমষ্টিগত পর্যায়ে অন্যরকম? এবং সেটাই কি পতনের সূত্র? দেশপ্রেম কি পাত্রভেদে পরস্পর বিরোধী? অস্ত্র এবং বিবেক, এ দুই কি দুই প্রান্তের? আমার কাছে মনে হয়েছে মৌলিক, এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করতে গিয়ে প্রায় কুড়ি বছর পরে নতুন এক জুলিয়ার সিজারকে আবিষ্কার করি।” সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজনীতি, ন্যায়বোধ, দেশদ্রোহীতার মতো বিষয়ের জিজ্ঞাসার উত্তর এসেছে। নাটকের চরিত্রে আছে রাষ্ট্রপতি ওসমান, তাঁর স্ত্রী, মির্জা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিকান্দার, সানাউল্লাহ, হুমায়ুন, দাউদ, আবু তাহের, ছাত্রদলের মতো কিছু চরিত্র; যা পঁচাত্তরের সমকালীন চরিত্রগুলোকে মনে করিয়ে দেয়।
নাটকের শুরুর দিকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এমন কিছু মন্তব্য পাওয়া যায়, যেখানে সিকান্দার বলে, “এয়ই হয়। প্রথমত মনে হয়, রাষ্ট্রের কল্যাণে করা, পরে দেখা যায়, রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হয়েছে ব্যক্তি। সমস্ত উদ্যমের লক্ষ্য হয়ে যাচ্ছে সেই ব্যক্তিটির প্রতিষ্ঠা রক্ করা।” এরপরই রাষ্ট্রপতি ওসমানকে আজীবন রাষ্ট্রপতি করার মতো আলোচনা উঠে। তারা নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করে আজীবন রাষ্ট্রপতি করা হলে এর পরিণাম কি হবে? ‘গণতন্ত্রের মৃত্যু; যার জন্য নিবেদিত ছিলো সকলের জীবন।’ এদিকে সানাউল্লাহ ওসমানের কাছের মানুষ। তারা একে-অপরকে ভালোবাসে। কিন্তু সানাউল্লাহ মনে হয় সেই ভালোবাসা দেশের থেকে বড় নয়। এবং সবচেয়ে বড় ক্ষতি কাছের এই ভালোবাসার মানুষই করেছে।
ঘটনা এভাবে এগুতে থাকে। ইতিহাসের চরিত্রগুলো যেন একে একে চলে আসে। আজীবন রাষ্ট্রপতি ঘোষণার দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যায়। এই ঘটনাকে কেউ কেউ মনে করে বীজ থেকে যেমন বড় বটগাছ হয়, তেমনই এখান থেকে হয়তো বড় নৈরাজ্যের সৃষ্টি হবে। তারা তার পতন কামনা করে। সানাউল্লাহ বলে এভাবে, “আগামীকাল বর্তমানকাল হওয়ার আগেই তাঁকে ঠেলে দিতে হবে অতীতে। সেখানে সিমান্ত প্রহরীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার খানও তার সাথে আছে।” অথচ যে মানুষটিকে তারা হত্যার পরিকল্পনা করে; দেশ স্বাধীনের সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে বরণ করল গণনায়ক বলে। লক্ষ লক্ষ হাত উৎক্ষীপ্ত হয়েছিল আকাশে, যেন লক্ষ লক্ষ পতাকা এই একটি মানুষের জন্যে, যে মানুষ দেশকে যতখানি আপন করে নিতে পেরেছেন দেশ তাঁকে আপন করেছে তারও চেয়ে বেশি করে।
নাট্যকার বলেছেন এভাবে, ‘বাংলার মহত্তম সন্তান তিনি। বাংলাকে ভালোবেসেছেন। যা দিলেন, তিনি ছাড়া কে দিতে পারতেন?’ সেই মানুষকে হত্যার পরে হুমায়ুন বলে, “যে গণনায়ককে আমি ভালোবাসতাম বিনাশর্তে, আমার হাতেই কেন তার এভাবে বিদায়?” আর হত্যার পর পরই সিকান্দার বলেছে ওঠে, “মুক্তি, স্বাধীনতা, নৈরাজ্যের অবসান।” বঙ্গবন্ধুর খুনিরাও ঠিক এরকমই বলেছিল। ইতিহাসের গণনায়কের প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়েছিল এই পতাকার তলে। না, তখন তিনি নন, লুটিয়ে পড়েছি আমি, আপনি, আমরা; তখন ছিন্নমূল হয়েছে আমাদেরই ভবিষ্যৎ। আর তখন মাথার ওপরে গর্জন করে উঠেছে বিশ্বাসঘাতকতার ঝড়।
এই দৃশ্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ওসমানের একটি সংলাপ মনে করতে পারি, “কাপুরুষ মৃত্যুর আগে বারবার মরে। বীর শুধু একবার। দীর্ঘ-এ জীবনে আমাকে অবাক করে দিয়ে যায় শুধু এই আবিষ্কার যে, মৃত্যুই নিশ্চিত তবু মৃত্যুকেই লোকে ভয় পায় ভয়াবহ ভাবে। মৃত্যু আসে, যখন সে আসে।” এভাবেই পুরো নাটক-জুড়ে যেন পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার কথা উঠে আসে।
বই: গণনায়ক, লেখক: সৈয়দ শামসুল হক
লেখক: কবিওয়ালা
