‘বাদশাহাত কা খাতমাহ’ গল্পে মৃণাল সেনের অন্তরীণ
একটা পুরনো প্রকাণ্ড নির্জন বাড়ি। যার ইট থেকে চুন সুরকি খুলে পড়ছে; আর নগ্ন ইট ইতিহাসের কথা বলছে। সেই কথায় নতুন গল্পের খোঁজে একা থাকছেন এক তরুণ লেখক। এ বাড়ি দেখে তার মনে হয়, ‘পাহাড় দেখেছি, গভীর অরণ্য দেখেছি, সমুদ্র দেখেছি কিন্তু এই অদ্ভুত নির্জনতা আর কোথাও দেখিনি।’ এরপর এক রাতে বেনামী অচেনা ভদ্রমহিলার ফোন আসে। তার সাথে কথা বলতে শুরু করে লেখক। কথার সাথে সিনেমার গল্প এগুতে থাকে এবং একই সাথে তাদের জীবনের বিবরণ প্রকাশিত হয়। এমনই এক চিত্রনাট্য নিয়ে মৃণাল সেনের পরিচালনায় ও সাদাত হাসান মান্টো রচিত ‘বাদশাহাত কা খাতমাহ’ নামে গল্পের কাহিনী নিয়ে নির্মিত “অন্তরীণ” সিনেমা। সিনেমায় লেখক চরিত্রে অভিনয় করেছেন অঞ্জন দত্ত এবং মূল নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডিম্পল কাপাডিয়া।
ডিম্পল কাপাডিয়া এখানে প্রেমহীন বিবাহে আবদ্ধ এক মহিলা। বাবার সংসারে বড় মেয়ে সে। মা নিজেই তাকে বিয়ে দিয়েছে। এছাড়া উপায় ছিলো না তার। ছোট-বড় সাত জনের সংসার আর রোজগার একজনের। ছোট ছোট ভাই বোন তাকিয়ে থাকে দিদির দিকে। একবার সে মনে করেছিল, ‘সবাই বিষ খেয়ে মরে যাক। তাহলে দুনিয়ার সবকিছু চুকে যাবে।’ এমন সময় একদিন একজন এসে বলেছিল সব দায়িত্ব সে নিবে। তার কথা শুনে তখন মেয়েটার মনে হয়েছিল বিশাল মন আর অঢেল টাকা। রাণী করে রাখবে ওখানে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আসল চেহারা বের হয়ে আসে। তাকে রেখে চলে গেছে তার সাহেব। এই অংশটুকু জহির রায়হানের ‘বরফ গলা নদী’ উপন্যাসের সালমা চরিত্রের সঙ্গে মিলে যাবে। এদিকে মেয়ের এই অবস্থার কথা তার মা জানে। অনুতপ্ত হয়ে একসময় ভাবে, ‘যে পাপ করেছে নরকেও তার জায়গা হবে না৷’
সারাদিন ঘুমোতে পারে না মেয়েটি। শূন্যতা তাকে গিলে ফেলছে। এমন কাউকে সে চায়; যে তার কথা শুনবে, তাকে জানবে, তার গল্পটা পড়বে। সে অপরিচিত নাম্বারে ফোন করে, কথা বলে। কখনো কখনো ফোনের ওপাশের মানুষ বিরক্ত হয়, লোভ করে। কিন্তু প্রকাণ্ড প্রসাদ তুল্য বাড়িতে যে টেলিফোনে ফোন আসে সেই টেলিফোনের মানুষটি বিরক্ত হয় না। ফোন আসার পরে তার মনে হয়, ‘একটা চমৎকার গল্পের কতগুলি ছিন্ন অংশ বসন্তের আকস্মিক বাতাসে এই বৃহৎ প্রাসাদের ঘরগুলির মধ্যে উড়ে বেড়াচ্ছে।’ এর খানিকটা দূর পর্যন্ত তাকে পাওয়া যায়। তাহার পরে আর শেষ দেখা যেত না৷ অন্যদিকে নাম না জানা মেয়েটাকে নিয়ে তার মনে কৌতূহল বাড়তে থাকে। প্রশ্ন জাগে, ‘কে এই রহস্যময়ী? সে কি কোনো মায়ের কোল থেকে বেদুইনের হাতে ছিনতাই হয়ে গেছে? যে এখন বন্দী অসীম ঐশ্বর্যের অনন্ত কারাগারে।’
তাদের দুজনের কথা চলতে থাকে টেলিফোনে। কিন্তু তখন কেউ কারো নাম জানে না। তবুও তাদের কথায় জীবনের বিবরণ প্রকাশ পায়। কথায় তাদের সম্পর্কের রং গাঢ় হয়। এই মুহুর্তগুলোয় বার বার মনে হবে; ‘মেয়েটা এখন বুক ফেটে কেঁদে বলবে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও। কঠিন মায়া, গভীর নিদ্রা, নিষ্ফল স্বপ্নের সমুদ্রের দ্বার ভেঙে আমাকে তোমার ঘোড়ার তুলে তোমার বুকের সাথে চেপে ধরে বনের ভিতর দিয়ে পাহাড়ের উপর দিয়ে নদী পার হয়ে তোমাদের সূর্যালোকে আমাকে নিয়ে যাও।’ না; মেয়েটা এমন কথা বলে না। সে একদিন ঘর ছেড়ে মায়ের কাছে যায়। মা তাকে জানায়, ‘মন্টু চাকরি পেয়েছে, বোনদের একজন টিউশনি করছে।’ তখন সে অন্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে একদিন সবাই নিজের পায়ে দাঁড়াবে। এই দৃশ্যগুলো নিন্মমধ্যবিত্ত কোনো পরিবারের প্রতিচ্ছবি। আর এমন পরিবারে সুন্দর দিনের অপেক্ষা করে স্বপ্নের মাঝে বাঁচা সময়গুলো যে কি ভয়াবহ রকমের সুন্দর তা দৃশ্যায়ন হয়েছে।
কথা মানুষকে মায়ায় ফেলে। এদিকে তারা তখন কথা চালিয়ে যায়। মেয়েটা ঘুমোতে পারে না রাতে; কিন্তু কখনো উদ্ধারের কথা বলে না। লেখকের মনের মাঝে দেখা করার আকাঙ্খা জাগে। কিন্তু সে যেন এক ক্ষুধিত পাষাণ; দেখা দেয় না। তবে ক্ষণিকের তরে দেখা হলেও কেউ কাউকে চিনে না। স্টেশনে মেয়েটা লেখকের কথা বলার ধরন দেখে বুঝতে পারলেও কথা বলার আগেই অন্য স্টেশনের উদ্দেশ্যে ট্রেনে উঠে যায় লেখক। ট্রেন চলছে আর জানালার পাশে বসে লেখক টেলিফোনে শোনা মেয়েটার কণ্ঠস্বরের রঙ দিয়ে দূর আসমানে ছবি আঁকছে।
সিনেমা: অন্তরীণ, পরিচালক: মৃণাল সেন
লেখক: কবিওয়ালা
