পাশবিক ও মানবিক অনুভূতিতে সৈয়দ হকের ঈর্ষা
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মানবিক অনুভবের কাব্যনাট্য ‘ঈর্ষা’। এ কাব্যনাট্য নিয়ে নাট্যকার বলেছেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, ঈর্ষা হয় এক বিস্ময়কর পরিস্থিতি; ঈর্ষা হয় একই সঙ্গে পাশবিক ও মানবিক একটি অনুভূতির সাধারণ নাম- যার মূল ক্ষেত্র প্রেম কিংবা দেহ-সংসর্গ; হয় বিস্ময়কর, মানবের বেলায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঈর্ষা আমি দীর্ঘকাল অবলোকন করেছি, দীর্ঘদিন এর সঙ্গে ঘরবাস করেছি; জীবনের সকল প্রসঙ্গের ভেতরে প্রেম ও দেহ-সংসর্গে স্থাপিত ঈর্ষাই আমার কাছে একমাত্র গ্রাহ্য হয়েছে। …এবং অনুসন্ধানে থাকি ঈর্ষার এমন কোন রূপ আছে যা কেবল মানবের ভেতরেই প্রকাশিত হওয়া সম্ভব।’ এই নাটকের ঈর্ষাও কেবল মানবের মাঝেই প্রকাশ পায়। এ নাটকটি মাত্র তিনটি চরিত্র প্রৌঢ়, যুবতী ও যুবক’কে নিয়ে রচিত। এখানে রয়েছে দীর্ঘ সাতটি সংলাপ।
তিস্তার পাড়ে বেড়ে ওঠা যুবতী। যুবতী যখন শৈশবে তখন পটুয়া কামরুল হাসান এসেছিল এক চিত্র অংকনের অনুষ্ঠানে। সেখানে যখন মেয়েটির খাতায় শিল্পী আঁক দিয়ে ছবি কাঠামো দিচ্ছিল, তখন সেই আঁকগুলো যেন মেয়েটির মনে এক শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিল। এরপরে শিল্পের টানেই আসে ইট-পাথরের শহরে। শিল্পের জন্যই মেয়েটি জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসানের প্রেমে পড়ে। এই প্রেম শুধু শিল্পী হিসেবে। এছাড়াও মেয়েটি আরও দুইজনের প্রেমে পড়ে; তাদের একজন তার স্যার। যিনি তার কাছে একাধারে শিল্পী এবং পুরুষ। আর আরেকজন যুবক; যিনি তার বিবাহিত স্বামী। অথচ স্যারের প্রতি যে ভালোবাসা ছিলো তা প্রকাশ করেছিল ফুলদানি এনে। একদিন শুধু ফুলদানি আনলে স্যার বলে, “ফুলদানি! কিন্তু ফুল? ফুল আনলে না?” তখন মেয়েটি বলেছিল, “আমি তো এসেছি।”
এই স্যার যিনি নাটকে প্রৌঢ় হিসেবে পরিচিত। তিনি যখন যৌবনে তখন এক মেয়ের প্রেমে পড়ে বলেছিল- ভালোবাসি। তারপর তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখেছিল। নিবিষ্ট তাঁতীয় মতো স্বপ্নের শাড়ি বুনেছিল। কিন্তু সে শাড়ি যেন পরে রইল তাঁতের রোলারে। একদিন সিঁদুরের রঙ দিয়ে আলপনা আঁকা চিঠিতে জানতে পারে সোনালি চশমা চোখে এক উঠতি সি-এস-পি’র সংগে তার বিয়ে। এ বিয়ে তার কাছে যেন লুট হয়ে যাওয়া গরীবের একমুঠো চালের মতো। এরপর থেকে সে ঈর্ষার আগুনে যেন জ্বলছে। তার ভিতরে যতটা প্রেম ছিল তার চেয়ে বেশি ছিলো নারীর প্রতি ঘৃণা, ছিল নারীর কাছে বারবার পরাজিত হয়ে নারীকেই নষ্ট করবার ক্রোধ। তাই বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও জয়নুল আবেদীনের কথা বলে কামনা করে, “তবু সাধ, তবু আশা, যদি আরেকবার ফিরে আসে প্রথম যৌবন। ‘তারে আমি আবার আঁকতাম।'”
প্রৌঢ় এঁকেছে যুবতীকে। নগ্ন করে তার দেহের প্রতিটি ভাঁজ এঁকেছে। তখন যুবতী নিতান্ত বালিকা। তার চোখে মুখে ছিলো শিল্পী হওয়ায় স্বপ্ন। সেই সুযোগে প্রৌঢ় তার হৃদয় নয় শরীরে, শরীরে শুধু, চামড়ায়, চামড়ার গভীরে নয়, মেদময় স্তনে ও নিতম্বে, তার ত্রিভূজে সন্ধান করেছেন শিল্প প্রতিভা। সেই মাংসের প্রতিমা যখন অন্যকে বিয়ে করে চলে যাচ্ছে তখন তিনি ঈর্ষার আগুনে জ্বলছে। এখানে প্রৌঢ়ের সেই মন্তব্য মনে করে যায়, “প্রেমিকের হৃদয় সে একমাত্র ঈর্ষার আগুনেই পোড়ে, এতকাল জানতাম- ঈর্ষার যে পোড়েনি, প্রেম সে হৃদয় ধরেনি; আজ আমি জেনেছি, ঈর্ষা এক ঠাণ্ডা নীল আগুন, ঈর্ষা বস্তুতপক্ষে ক্রোধের বরফ- ঈর্ষায় একমাত্র প্রেমহীন পোড়ে।”
এদিকে যুবতীর স্বামী সেও শিল্পী। একাত্তরে যখন শকুন এসে হানা দিয়েছিল মাথার উপরে, রাতের আঁধারে যখন পুরো দেশে ট্যাংক এসে ধ্বংসলীলা শুরু করেছিল, কৃষকের স্বপ্ন যখন লুট হয়েছিল, ঘরে ঘরে বোনেরা যখন সম্ভ্রম হারিয়েছিল; তখন এই যুবক যুদ্ধে গিয়েছিল। যুদ্ধ যাবার কালে তার মা তাকে বলেছিল, “তুই না ফিরিস তাতে দুঃখ নেই, দিন যেন ফেরে।” সেই দিনের স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ শেষে ঘরে আসে। আবার হাতে রং আর তুলি তুলে নেয়। কিন্তু স্বাধীন দেশেই রাজাকারের হাতে তার বাবা খুন হয়েছে। বোন তার সম্ভ্রম হারিয়ে বটগাছের সঙ্গে ফাঁস নিয়ে মারা গেছে। সেই শোকে আজ অবধি তার মা বোবা। শিল্পের ছলনায় প্রৌঢ় যুবতীর সঙ্গে যা করে সেই ঘটনাকে যুবক যেন সেই একই অর্থে দ্যাখে। সে বলে, “পরিষ্কার দেখা যায় আপনার মুখের ওপরে, একভাবে ওরা যা করেছে, অন্যভাবে আপনিও তাই করেছেন।”
অথচ যুবক স্বপ্ন দেখেছিল যুবতীকে নিয়ে এভাবে, “আমার দু’চোখে আমি তুমি ছাড়া কাউকে দেখিনি; বাংলার সবটুকু শ্যামলতা নিয়ে আমার হৃদয় জুড়ে ছিলে তুমি। তোমাকেই মনে হতো বাংলাদেশ; তুমি গর্ভবতী হবে, সন্তানের জন্ম দেবে, এমন সন্তান যার পথ চেয়ে আছি।” কিন্তু স্যার আর প্রেমিকার সম্পর্ক যেন তাকে নতুন করে ভাবায়। সে ভাবে, ‘এটা তো কাবাডি খেলা নয়, যে দম থাকাকালীন এক হয়ে থাকা আবার নিঃশ্বাস শেষ হলেই হাসতে হাসতে আলাদা হওয়া।’ উত্তরের কোনো এক গ্রামে এই যুবকেরও শৈশব কেটেছে। সে দেখেছে মিলনের আশাহীন আত্মঘাতী যুবক আর যুবতীকে গাঁদাফুলের মালা বুকে যমুনায় লাশ হয়ে ধীরে ভেসে যেতে।
শরীরের যে কামনা আছে তা মানুষ একটা বয়স পরে আবিষ্কার করতে পারে। যুবক তেমনই একদিন এই বিষয়টা আবিষ্কার করে। শুধু শরীর না, তার সাথে সে হৃদয়ও আবিষ্কার করে। স্যার আর প্রেমিকার সম্পর্কে সেই হৃদয়ে তার ঈর্ষার সৃষ্টি হয়। সে ত্যাগ করে স্যারের কাছেই তাকে দিয়ে দেয় এবং নিশ্চিত করে বলে, “এখনো আমি আপনার মতো করে সমস্ত খসিয়ে তার শরীর দেখিনি; কল্পনা করেছি কেবল, আর বড় প্রতীক্ষা করেছি।” কিন্তু সেই প্রতীক্ষা যেন তার সাথে প্রতারণা করেছে। যাকে সে সবুজ বাংলাদেশ ভাবতো; তার জমিনে কেউ যেন আগেই স্বপ্নের বীজ বুনেছে। আর তার অধিকার বা দু’জনের ভালোবাসা স্পষ্ট থাকাকালীন সে কিভাবে অধিকার রাখবে। তাই তো প্রতারিত হয়ে ঈর্ষায় দূরে সরে যায়। যুবকের শেষ উক্তি যেন এমনই ঈঙ্গিত দেয়, “প্রেম যদি প্রতারণা করে তবে শিল্প দেবে আমাকে আশ্রয়; আমার শিল্পের হাত কেড়ে নেয় আছে সাধ্য কার? এ নারী আপনার।”
বই: ঈর্ষা, লেখক: সৈয়দ শামসুল হক
লেখক: কবিওয়ালা
