নষ্ট শহরে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা এক অচেনা মাস্তান
“আমি তো তাদেরই জন্য,
সূর্যের দিকে চেয়ে থাকবার অভ্যাসে যারা বন্য!
আমি তো তোমারই জন্য,
কপাল রাঙানো যে মেয়ের টিপ রক্তের ছোপে ধন্য!”
কথাগুলো বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী খান মুহাম্মদ ফারাবির একটি কবিতার অংশ। ফারাবী সত্তরের দশকে খুন হয়েছিলেন। কিন্তু সাম্যের সমাজ গঠনের সংগ্রামে ফারাবি ছিলেন তরুণ সঞ্জীব চৌধুরীর অনুপ্রেরণা। নিজের কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই সঞ্জীব চৌধুরী এই লাইনগুলো বন্ধুদের শোনাতেন। দলছুট’র সঞ্জীব’দা একাধারে গীতিকার, গায়ক, কবি, গল্পকার, নাট্যকার, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক এবং সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি বিপ্লবী। সাম্যের স্বপ্ন নিয়ে সেই বিপ্লবের আগুন বুকে জ্বালিয়ে নিজেকে দেখেছে সেই সকল বিপ্লবীর মাঝে যারা- যারা ক্ষমতার বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে কথা বলে- যাদের কপালে লাল টিপের মত ছোপছোপ রক্ত লেগে থাকে।
সঞ্জীব চৌধুরী নিজের কথা, সুর, কণ্ঠের মায়াজাল আর বিপ্লবীর যাপনে মানুষকে বন্দী করেছিলেন। তিনি মানুষের ভীড়ের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে, আড্ডার বাঁশি বাজিয়ে মানুষ জমিয়ে মানুষ অন্তরের কথা শুনতেন। এরপর যখন একা হয়ে যেত- তখন শুনতেন তার মত একা মানুষের কথা। তাঁর অসম্ভব ক্ষমতা ছিলো মানুষকে আপন করার। তাইতো এখনো হাজারো তরুণ তার স্বপ্ন বুকে পুষে সঞ্জীব চৌধুরীর গ্রাফিতিওয়ালা টিশার্ট গায়ে দিয়ে রাস্তায় ঘুরে, মিছিলে যায়, কিংবা রাতের ছন্নছাড়া মানুষকে দেখে। তাঁর মতো মানুষকে গভীর ভালোবেসে হয়তো নিরব রাতের শহরে গেয়ে ওঠে-
“তাকে নিয়ে দু–একটি গান গেয়ে যাই
আমাদের গানে তার দুঃখ বিকাই
দুঃখের বেচাকেনা বাজার সরব
ছেঁড়া স্যান্ডেল হাতে ছেলেটা নিরব…।”
অসম্ভব প্রতিভাবান সঞ্জীব শিক্ষা জীবনে শুরুর দিক থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকা কলেজে পড়াকালীন একটি বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক সমাজের স্বপ্নে তিনি মেধা ও জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই লক্ষ্যে আমৃত্যু তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একদিকে গান অন্যদিকে রাজনীতি এবং সেই গানের কথাতেও তিনি মানুষের স্বপ্নের কথা ফেরি করেছেন। তিনি বারবার মনে করে দিয়েছেন মানুষের হৃদয় কাঁপানো স্বপ্নের কথা, নিশ্চিত বিজয় আর সমান অধিকারের কথা। কিন্তু সেই স্বপ্নে যখন শকুন দেখা দিচ্ছিল তখন তিনি স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে। এই এরশাদের বিরুদ্ধে সমান অধিকারের কথা বলার কারণে এরশাদের গুণ্ডারা আদমজীর চাকরিজীবী তাজুল ইসলামকে পিটিয়ে মেরেছিল। সেই দুঃশাসন আর শোষণের অবসানে মানুষকে রাজপথে উদ্বুদ্ধ করতে গামছায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে বিপ্লবের সুরে স্বপ্নের গান গেয়েছিল।
সঞ্জীবের গানের সুরে সুরে ছিল এক স্বপ্নের হাহাকার। এরশাদের দুঃশাসনকে মানুষের মুখোমুখি করে তিনি গাইছেন-
“আমি ঘুরিয়া ফিরিয়া সন্ধান করিয়া,
স্বপ্নের অই পাখি ধরতে চাই,
আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই…।”
টিএসসিতে কনসার্ট ফর ফাইটার-এ এই গান গাইতে গাইতে তিনি মানুষকে সত্য ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বলেন আমি এবার বক্তৃতা দিবো। তার বক্তৃতা অন্যায়কারীদের বিদ্ধ করে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপর সকল ক্ষোভ আর ক্রোধ ঢেলে টিএসসি’তে দাঁড়িয়ে তিনি বলে উঠেন- “ওরা বলে, ওই গাড়িতে করে আমাদের জন্য খাদ্য আর পানীয় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন বন্ধুগণ, আমি জানি, ওই গাড়িতে আমাদের জন্য কোনো খাদ্য ছিল না, আমাদের জন্য কোনো পানীয় ছিল না। ৩শটি লাশ! ৩শটি লাশ ঠান্ডা, হিম! যাদের খুন করে ফেলা হবে। আমি বলতে চেয়েছিলাম সেই সত্য কথা। আর তখনই আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্ধত রাইফেল। আমার দিকে এগিয়ে আসে উদ্ধত বেয়নেট। ওরা বলে, খামোশ! তবুও বন্ধুগণ, আমার স্বপ্নেরই কথা বলতে চাই, আমার অন্তরের কথা বলতে চাই…।’
তিনি ওই কনসার্টে সেই সময়ের আইনমন্ত্রী এবং এরশাদের উপ প্রধানমন্ত্রী মওদুদ চৌধুরীকে নিয়ে বলছে এভাবে- ‘একজন খুনি আমাদের এখন আইন শেখায়। অথচ আমরা যদি তাজুল হত্যার কথা বলি- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, বিশৃঙ্খলাকারীকে ধরিয়ে দেন।’ তিনি কর্ণেল তাহেরের স্বপ্নের কথা বলেছেন। সেই স্বপ্নের মানুষকে কে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দিয়েছিল? এই প্রশ্ন জনতার মাঝে ছুড়ে দিয়ে তিনি সত্য ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বলেন- ‘আপনারা যদি খুনির নাম চিৎকার দিয়ে না বলেন- তাহলে আমি চলে যাবো এখান থেকে। আর গান গাইবো না।’ শুধু কনসার্ট কিংবা গানের কথায় না। তিনি ‘রাশপ্রিন্ট’- বইয়ে বলেছেন, ‘লেফটেন্যান্ট জেনারেলের ট্রাকের চাকার নিচে ফেটে যাওয়া দিপালী সাহার হৃৎপিণ্ডের কথা।’ যার রক্তিম হৃদপিণ্ডের কথা বর্তমান তরুণ সমাজ ভুলেছে প্রেমিক-প্রেমিকার লাল গোলাপে। এখন দিপালীর লাল হৃদপিণ্ড ভ্যালেন্টাইন-বেলুন বানিয়ে বেচা হয়।
হুমায়ুন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ যখন পড়েছি তখন বাকেরের মাঝে নিজেকে খুঁজেনি এমন তরুণ বোধহয় কমই আছে। বাকের ভালোবেসেছিল মুনাকে। মুনা রূপের দেবী বা পরী নয়; কেবলই মেয়ে ছিলো সে- শামলা বর্ণের মেয়ে। যে মেয়ে তার চাহনি, কথা, আর হাসি দিয়ে বাকেরের মতো ছেলের মনে তোলপাড় তুলেছে। এই তোলপাড় দেবী বা পরীরা তুলতে পারে কি না আমার জানা নেই। কিন্তু এটা জানি এই সকল বাকেরদের দিনের সকল কথা, সকল পাগলামি কেবল সেই মেয়েকে লক্ষ্য করে। কিন্তু মুখে কখনোই বলা হয় না- তার ভালোবাসার কথা। নিজের জীবনে ডোন্ট কেয়ার- কিন্তু মহল্লায় যে কারো সমস্যায় পাশে থাকা সেই সকল ‘মাস্তান’র চরিত্র আমার ভীষণ প্রিয়। আমাদের কৈশোরের গল্পে এমন বন্ধুদের আমরা বারবার ফিরে আনি। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র- তখন ইউটিউবে গান শুনতে গিয়ে হঠাৎ সামনে আসে সঞ্জীব চৌধুরীর দরদ মাখা কণ্ঠে-
“এই নষ্ট শহরে;
নাম না জানা যে কোনও মাস্তান!
সকালে ঠিক খিস্তি-খেউড় রাজা-উজির মেরে,
মাস্তানি সব সেরে;
বিকেল বেলা তোমার বাড়ির লাগোয়া পথ ধরে,
যাচ্ছে যখন ফিরে…”
এই গান নিয়ে পরে জেনেছি বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, তাত্ত্বিক ও কবি ফরহাদ মজহারের কবিতাকে গানে রূপ দিয়েছে সঞ্জীব চৌধুরী। শহরের পাড়া মহল্লায় ছড়িয়ে থাকা নাম না জানা অচেনা মাস্তানদের ব্যর্থ প্রেমের প্রতি কি গভীর ভালোবাসা এই গানের কথা ও সুরে- যা শুনলে এখনো আমাকে আবেগ তাড়িত করে। সঞ্জীব চৌধুরী শুধু এই গান নয়, লোক-পরিচিত তার অনেক গান কবিতা থেকে তৈরি। নিজের লেখা কবিতাকেও তিনি গানে রূপ দিয়েছেন। তাঁর লেখা ৪৫টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘সঞ্জীব চৌধুরীর গানের কবিতা’। এদিকে কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হকের কবিতাকে তিনি গান বানালেন-
“আমার বয়স হলো সাতাশ,
আমার সঙ্গে মিতা পাতাস…”
প্রেম আর দ্রোহ হৃদয়ের তরুণদের কাছে সঞ্জীব চৌধুরী একটি হৃদয়াশ্রয়। তিনি যেন দরদ দিয়ে ব্যর্থ হৃদয়কে ছুঁয়ে গেছেন। সঞ্জীবনামা বইয়ে টোকন ঠাকুর বলছে এভাবে- “বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাতজাগা তরুণেরা তার গান গেয়ে হলে ফিরে, ঘরে ফিরে কিংবা তারা আর ঘরেই ফিরে না। না ফিরে তারা কোথায় যায়? নৈশ হাওয়ায় ভেসে আসে, কতজন যে গায়-
“আমি তোমাকেই বলে দিবো
কি যে একা দীর্ঘ রাত
আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে।”
আবার প্রেম আবেগের মধুর স্মৃতি মনে করে তারই গান কেউ কেউ গেয়ে ওঠেন-
”তোমার বাড়ির রঙের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ
বায়স্কোপের নেশা আমার ছাড়ে না…।”
সঞ্জীব চৌধুরী যে স্বপ্ন দেখেছিলেন- সেই স্বপ্নের পথে, অন্যায় কিংবা কোন শক্তির সঙ্গে কখনোই আপোষ করেননি। সাম্যবাদে বিশ্বাসী এই মানুষটি বিশ্বাস করতেন এই সমাজে একদিন সাম্য আসবে। সেই সাম্যের লড়াইয়ে গিয়ে তিনি নানান রকমের মানুষের সম্মুখীন হয়েছে। মানুষ হয়ে মানুষের কথা বলতে গিয়ে তাদের থেকে কষ্টে পেতে হয়েছে তাঁকে। মানুষের বোধ থেকে অনুভব করে তিনি প্রায়ই গাইতেন-
“মানুষ জন্ম দিয়ে বিধি,
পাঠিও না পৃথিবীতে,
এত দুঃখ পেলাম আমি,
মাপার মতো নেইকো ফিতে…।”
দুঃখ মাপতে না পারলে সবার দুঃখকে তিনি ছুঁয়ে ছিলেন। এই মানুষটি কেবল মানুষ ছিলো। তার কাছে-দূরে-ছোট-বড়-ধর্ম-অধর্মের কোনো ভেদাভেদ ছিলো না। সহজেই আপন করে নিতো সবাইকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট শহীদ তাজুল ইসলামের জন্য যেমন তিনি রাজপথে খুনি এরশাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছে- তেমনই দিনাজপুরের গরীব গৃহকর্মী ইয়াসমিন পুলিশের হাতে ধর্ষিত এবং হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে দাঁড়িয়ে বোন হত্যার বিচারের দাবি নিয়ে মিছিল করেছে। পরবর্তীতে সেই ইয়াসমিনের স্মৃতিতে তিনি গেয়েছিলেন ‘আহ্ ইয়াসমিন’। এদিকে মানবিক হৃদয়ের সৃষ্টিশীল এই মানুষ জীবনটাকে খুচরো পয়সার মতো খরচ করেছে। জীবনকে জ্বালিয়ে আলো জ্বালানোর যে প্রণালী গ্রহণ করেছিল তা তনুদেহ সইতে পারেনি। গান, বিপ্লব আর স্বপ্নের এই পাগলটি কষ্ট নিয়ে চলে গিয়েছিল ঠিক তার গানের কথার মতো-
“পাগল রাগ করে চলে যাবে, খুঁজেও পাবে না
পাগল কষ্ট চেপে চলে যাবে, ফিরেও আসবে না…।”
কিন্তু সঞ্জীব চৌধুরী তো শুধু দলছুটের গায়ক বা সাংবাদিক সঞ্জীব না। তিনি ছিলেন বিপ্লবী- আর বিপ্লবীদের কখনো মৃত্যু হয় না। মৃত্যু নিয়ে এক আলোচনায় সঞ্জীব চৌধুরী বলেছিলেন- “টিএসসি চত্বরে কিংবা আজিজ সুপার মার্কেটে আমি থাকব না, সেটা কি কখনো কল্পনা করা যায়! গিয়ে দেখবেন, আমি সেখানে মস্ত আড্ডা জমিয়ে বসে আছি।” আজও আমরা যখন টিএসসি কিংবা মুক্তমঞ্চে সঞ্জীবের গ্রাফিতি সংবলিত টিশার্ট গায়ে ছেলেদের তারই গান গাইতে দেখি- তখন তাঁর ওই কথাটা সত্যি মনে হয়। সঞ্জীব দলছুটের গানে আছেন, মধ্যরাতে ঘরে না ফেরা ছেলেদের কণ্ঠে আছেন, মহল্লায় বাকেরের মতো নাম না জানা অচেনা মাস্তানের মতো ব্যর্থ প্রেমিকের কণ্ঠে মিশে আছে।
১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বরে সঞ্জীব চৌধুরী হবিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ব্যক্তি জীবনের প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ সঞ্জীব চৌধুরী বিয়ে করেছিলেন খন্দকার আলেমা নাসরীন শিল্পী’কে। সেই প্রগতিশীলতার পরিচয় তার মৃত্যুর পরেও দিয়েছেন। ধর্মের রীতি কিংবা সংস্কৃতির বাহিরে গিয়ে তিনি নিজের দেহ’কে দান করেছিলেন ঢাকা মেডিকেলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য। জীবনের প্রতিটি লড়াইয়ে তিনি মানুষের কথা বলতে চেয়েছেন। মৃত্যুকালে দেহদানের মাধ্যমে তিনি যেন তার শেষ স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
এই মহান বিপ্লবী-শিল্পী-মানুষ ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক: কবিওয়ালা
