তাঁর প্রেম-দ্রোহ-দুঃখের জলে আগুন জ্বলেছিল
“আমাকে না চেনা মানে
সকালের শিশির না চেনা,
ঘাসফুল, রাজহাঁস, উদ্ভিদ না চেনা
গাভিন ক্ষেতের ঘ্রাণ, জলের কলস কাক
পলিমাটি চেনা মানে আমাকেই চেনা!” _হেলাল হাফিজ
সকালের শিশির, ঘাসফুল, ক্ষেতের ঘ্রাণ, জলের কলস, কাক, পলিমাটি যেমন মাটি-মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ তেমনই কবি হেলাল হাফিজ যুগে যুগে আসা লক্ষ শত তরুণ তরুণীর প্রেম ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, বিষাদ, অভিমান আর একাকিত্বের অবিচ্ছেদ্য কাব্যভাষা। এই কবির প্রতিটি লাইনেই মানব-মানবীর প্রেম আবেগ ও অভিমান যেন হৃদয়ের গভীরে ছুঁয়ে যায়। কবি সকল প্রেম হৃদয়ের কামনা নিয়ে লিখছেন,
“আমার জীবন ভালোবাসাহীন গেলে
কলঙ্ক হবে কলঙ্ক হবে তোর।”
এই সকল প্রেম অভিমানের কবিতার মতো তাঁর সৃষ্টিশীল হাতের ছোঁয়ায় সৃষ্ট দ্রোহের কবিতায় বিদ্রোহাগ্নির সৃষ্টি করে। দেশের রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থা তাঁর হৃদয় ছুঁয়ে বিপ্লবের অগ্নিগিরি লাভায় কবিতার সৃষ্টি করেছিল। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময়গুলোতে কবি নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’তে লিখেছিলেন-
“এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।”
‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা যখন লেখা হয় তখন কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় ছাপানোর জন্য ওই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবিবের কাছে যান। কিন্তু সে সময় এই কবিতাটি ছাপতে পারেননি এই সম্পাদক। হেলাল হাফিজ সম্পাদকের সেদিনের কথা বর্ণনা করে বলেছিলেন এভাবে, ”এই কবিতা ছাপা যাবে না। ছাপলে আমার চাকরিটা চলে যাবে। পত্রিকা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তবে একটা কথা বলি, হেলালের আর কোনো কবিতা না লিখলেও চলবে। অমরত্ব ওর করায়ত্ত হয়ে গেছে।” কবিতা ছাপতে না পেরে হেলাল হাফিজ এবং আহমদ ছফা ফিরে আসেন। এরপরে রাতের বেলা আহমদ ছফা-সহ অনেকেই নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় কবিতার ওই দুটো লাইন দেয়ালে দেয়ালে লিখে দিয়েছিল। মাত্র দুই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ক্যাম্পাসের প্রতিটি দেয়াল ভরে গিয়ে ছিলো ‘এখন যৌবন যার…’ কবিতার কথায়।
এটা উনসত্তরের দৃশ্যপটের কথা হলেও চব্বিশে এসে নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় কবিতার এই লাইনদ্বয় এখনো ঢাকা শহরের দেয়ালে দেয়ালে দেখা যায়। সমাজে যারা সকল অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চায়- তাদের কণ্ঠস্বর যেন এই কবিতা। ২৪-এ অন্যায় অনাচার এবং মানুষ হত্যার প্রতিবাদে যাদের ঢল গণ-অভ্যুত্থানের সৃষ্টি করেছিল- তাঁরাও যৌবন আর তারুণ্যের জয়গান গেয়েছিল। উনসত্তরের আসাদ যেন আবু সাইদ হয়ে ফিরে এসেছিল। ঘাতকের বুলেটের সামনে বুক চেতিয়ে দিয়ে দেশের যুবকদের মিছিলে আহ্বান করেছিল। এমনদৃশ্য কল্পনাচিন্তা থেকে হেলাল হাফিজ সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘কিন্তু কিছু মানুষ তো ব্যতিক্রমী থাকবেই। তারা রুখে দাঁড়াবে। অন্যায়-অবিচারের অবসান চাইবে।’
কবি হেলাল হাফিজ ১৯৪৮ সালে ৭ অক্টোবর নেত্রকোনায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জন্মের তিন বছরের মাথায় তার মা মারা যান। মায়ের কথা স্মরণ করতে গিয়ে কবি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভালোবাসাটি আমি অনুভব করতে পারিনি। আমি ছিলাম খেলাধুলার মানুষ। কিন্তু যতই বয়স বাড়তে লাগল। মাতৃহীনতার এই বেদনা আমাকে গ্রাস করে ফেলল।’ এই ভালোবাসার শূন্যতা কতটা প্রখর ছিলো তা কবির কবিতায় অনুভব করা যায়। কবি লিখছে-
“আমার শৈশব বলে কিছু নেই
আমার কৈশোর বলে কিছু নেই,
আছে শুধু বিষাদের গহীন বিস্তার।”
বিষাদের গহীন বিস্তার যে জীবনে- সেই জীবনে যখনই যার কাছে তিনি ভালোবাসা পেয়েছেন- তার কাছে বিনয় চিত্তে মাথা নত করেছেন। মাতৃহীন হেলাল হাফিজ স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরে তার এক শিক্ষিকা তাকে স্নেহ করতেন। কবি এই শিক্ষিকার মাঝে মাতৃস্নেহ খোঁজে পেয়েছিলেন। উনার নাম ছিলেন সবিতা। হেলাল হাফিজ মাতৃস্নেহ পাওয়া সবিতা মিস্ট্রেস’র কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ”হক ভাই তাঁর প্রেমিকার জন্য প্রতিদিন একটা করে কচুরিপানার ফুল নিয়ে আসতেন। একদিন সবিতা মিস্ট্রেস বললেন, এখন থেকে দুটো করে ফুল আনবে। একটা আমার জন্য, আরেকটা হেলালের জন্য। হক ভাই তা-ই করতে থাকলেন। কচুরিপানার ফুলের প্রতি সেই প্রিয়তা আমার আজও রয়ে গেছে।”
কবি হেলাল হাফিজকে যে যেভাবেই ভালোবেসেছে- তাঁকে সেভাবেই মনের গহীনে লালন করেছে। কৈশোরের শেষ প্রান্তে এসে কবিকে ভালোবেসে যে কিশোরী তার ধরে অরণ্যের গহীন পথ পাড়ি দিতে চেয়েছিল। সেই মানুষটির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় কিছুদিন পরে মেডিকেলে ভর্তি হলে। এরমাঝে হৃদয়ের সমস্তটা দখল করে জীবনে এসেছিল হেলেন। কবিতায় তার কথা বারবার এসেছে। হেলেন কবিকে সুখ-কাব্যময় সংসারের স্বপ্ন দেখিয়েছ। কবিতায় লিখছেন এভাবে-
“ইচ্ছে ছিল রাজা হবো
তোমাকে সাম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো,
আজ দেখি রাজ্য আছে
রাজা আছে, ইচ্ছে আছে,
শুধু তুমি অন্য ঘরে।”
হ্যাঁ, হেলেনও অন্যঘরের মানুষ হয়েছিল। যখন হেলেন হেলালকে ছেড়ে চলে যায়- তখন কবির জীবনে আরেকটি বড় দূর্ঘটনা ঘটে। তার বাবা মারা যায়। এদিকে হেলেন এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কবির বাবা মারা যাবার বেশকিছু দিন পরে একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হেলেন কবিকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ জানায়- ‘আমি তো অন্য একজনকে বিয়ে করতে যাচ্ছি।’ কবির জীবনে পরপর এই দুটি ঘটনা তাঁকে ভিতরে ভিতরে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। বাহিরে বাহিরে কবি সহাস্য থেকেছে, অর্থ সমস্যায় শামসুর রাহমান এবং হাসান হাফিজুরের কাছে সমাধান পেয়েছে। কিন্তু হৃদয়ের কথা কথাগুলো কলমের কালিতে লিখেছে-
“কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো।
কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না
রাত কাটে তো ভোর দেখি না
কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না কেউ জানেনা।”
কবি হেলাল হাফিজের জীবনের না জানা সকল বিরহ ব্যথা এবং কথা তিনি বলে গেলেন কবিতায়। তার কবিতায় প্রেম আকুতি আর বিরহের কথা স্পষ্ট। এই দৃশ্য তার জীবনেও উজ্জ্বল। যুগে যুগে যে মানব শিশু পূর্ব পুরুষের বিচ্ছেদ-বিরহের আত্মার সত্ত্বা নিয়ে জন্ম নিবে- মানব, প্রেম আর সংসার জীবনে হেলাল হাফিজের কবিতাই তার কণ্ঠস্বর। এই তার দুঃখ, বিরহ ব্যথাকে সত্য শিল্পে রূপান্তরিত করতে পেরেছেন। তিনি তার শিল্পে মানুষের কষ্ট ফেরি করেছেন। কবি লিখেছিন-
“কষ্ট নেবে কষ্ট !
লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট
পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট,
…
একটি মানুষ খুব নীরবে নষ্ট হবার কষ্ট আছে।”
এতো স্বল্প লিখে এতো মানুষের কষ্ট বাংলা সাহিত্যে আর কোনো কবি ফেরি করতে পেরেছেন কি না তা জানা নেই। কিন্তু এই কষ্টের ফেরিওয়ালা সার্থক- সে জন্মান্ধ মানুষকে পাথর চাপা দূর্বাঘাসের কষ্টের রং দেখাতে পেরেছিলেন। এমনই এক ঘটনা ঘটে সিলেটে; বেশ কয়েক বছর আগে সিলেট শহরে এক কবিতা উৎসবে কবির আসার খবরে জন্মান্ধ স্বামী স্ত্রীর হাত ধরে ওই উৎসবে এসে কবিকে বলেছিলেন- “আমি দুনিয়ার আলো দেখিনি। কিন্তু দুটো জিনিস অন্তরের আলোতে দেখতে পাই। এক আমার স্ত্রীর সৌন্দর্য, দুই আমার স্ত্রী যখন আপনার কবিতা পড়ে শুনায় তখন পাথর চাপা ঘাসের কষ্টের রংটা দেখতে পাই। আপনি আমাকে এই রংটা দেখিয়েছেন। আপনাকে ভালোবাসা জানানোর জন্য আমি এখানে এসেছি।”
কবিতায় তিনি মানুষের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন, জীবন ভরে ভালোবাসা জমিয়েছেন। কবিতাও তার জীবনে মানুষের ভালোবাসা-আদরের নদী বয়ে এনেছে। মানুষের এই ভালোবাসা তাঁকে একাকিত্ব কাটাতে সহযোগিতা করেছে। একাকিত্ব কাটাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে কখনো লিখেছেন-
“নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতোটা পথ একলা এলাম
পেছন থেকে কেউ বলেনি করুণ পথিক
দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও,
কেই বলেনি ভালো থেকো সুখেই থেকো
যুগল চোখে জলের ভাষায় আসার সময় কেউ বলেনি
মাথার কসম আবার এসো
…
কেউ ডাকেনি তবু এলাম, বলতে এলাম ভালোবাসি।”
যাকে বলেছিল ভালোবাসি। কবির ওই ভালোবাসা যেন কবির হৃদয়ে বিরহের সোনার ফসল চাষাবাদ করেছিল। শেষ জীবনেও কবিকে কি করছেন- এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন- ভালোবাসার চাষাবাদ করছি। যার ভালোবাসা কবিকে আমৃত্যু ভালোবাসাহীন অনুভব করিয়েছে তার কাছে কবি নিজেকে ঋণী মনে করেছে। কবি লিখেছেন-
“খোদার কসম হিরণবালা
তোমার কাছে আমিও ঠিক তেমনি ঋণী।
তোমার বুকে বুক রেখেছি বলেই আমি পবিত্র আজ।”
প্রেম, বিরহ, অভিমান আর বিদ্রোহের পবিত্র কবি হেলাল হাফিজ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর অপারেশন সার্চ লাইট চালানোর সময় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। ২৭ মার্চ কবিকে হলের গেটের পেয়ে বন্ধু নির্মলেন্দু গুণ তাঁকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছিল সেদিন। যুদ্ধের আগে বিশ্বযুদ্ধের বর্বরতার কথা কবিকে স্তব্ধ করেছিল। কবি সেই বর্বরতা দেখে ওই সভ্যতাকে প্রশ্ন করেছিল। সবচেয়ে ছোট কবিতায় লিখেছিলেন-
“নিউট্রন বোমা বোঝো,
মানুষ বোঝো না!”
ইতিহাসের এই বর্বরতা ফিরে আসে কবির চোখের সামনে। জল্লাদের লোমশ হাতে যখন সভ্যতা ধ্বংস হচ্ছিল, ঘাতকের বুলেটে সোনার বাংলা যখন শ্মশানে পরিণত হচ্ছিল- তখন কবি দেখেছিল মারণাস্ত্রের সঙ্গে বাংলা মায়ের সন্তানদের ভালোবাসা। কবি লিখেছেন মারণাস্ত্রের সঙ্গে ভালোবাসার কথা। এই লিখতে লিখতে একটি পতাকার স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু পতাকা পেয়েও যখন হাহাকার দেখা দিচ্ছিল তখন কবি তার স্বপ্নের কথা লিখলেন-
“কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে
আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে,
সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে সমান সুখের ভাগ
সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে।”
এই হাহাকার মোচনে এবং সুষমে বণ্টনে যারা বাঁধা তৈরি করছে। যারা পুরনো শকুনের মতো ছিবড়ে খাচ্ছে জাতির ভাগ্যরেখা। সেই মানুষেরা যেন বাঙালি জাতির বীরত্বের স্মৃতি এবং কথা আবারও মনে রাখে। বাঙালি সকল অন্যায়, অনাচার আর অবিচারের বিরুদ্ধে যৌবনের প্রতীক হয়ে প্রথমে মিছিলে এবং পরবর্তীতে মারণাস্ত্রের সঙ্গে বসবাস করেছিল। সেই অন্যায় অনাচার আর দুর্দিন যদি ফিরে আসে- আবারও যৌবনের গান গেয়ে মিছিল নিয়ে মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে নেমে আসবে। যদি প্রয়োজন হয়- তবে আবারও কালো কারাগার ভেঙে মারণাস্ত্রের সঙ্গে ভালোবাসার আলিঙ্গন করবে। এসবই মনে করিয়ে দিয়ে কবি লিখেছিলেন-
“মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালোবাসা তোমার আমার।
…
অথচ তোমাকে আজ সেই আমি কারাগারে
সমর্পণ করে, ফিরে যাচ্ছি ঘরে
মানুষকে ভালোবাসা ভালোবাসি বলে।
যদি কোনোদিন আসে আবার দুর্দিন,
যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবে না প্রেম মানুষে মানুষে
ভেঙে সেই কালো কারাগার
আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার।”
বাংলার জমিনে জাতির ইতিহাসে চব্বিশের অভ্যুত্থান যেন ফ্যাসিস্টের সকল কালো কারাগার ভেঙে মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে মিছিলে মানুষের প্রণয়। চব্বিশের শীতে বাংলা নামক বৃক্ষ থেকে কবি হেলাল হাফিজ নামক একটি পাতা নিরবে ঝড়ে গেলো। এই ঝরা পাতা আমাকে জীবনানন্দ দাশের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে-
“মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব
থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে।”
হে প্রিয় কবি- আজ এবং আগামীর মানুষের কাছে আপনিও থেকে যাবেন। যে জ্বলে আগুন জ্বলে কবিতার কথাতে, বাংলার জমিনে তারুণ্যের মিছিলে, প্রেমহীন বিরহ কাতর সকল হৃদয়ে।
লেখক: কবিওয়ালা
